গ্রাহকদের প্রায় ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে একটি সমবায় সমিতি লিমিটেডের পরিচালক আরিফা খাতুনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতার আরিফা খাতুন সাতক্ষীরা মাছখোলা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
বুধবার দুপুরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার পুরাতন সাতক্ষীরার মায়েরবাড়ী মন্দিরের পার্শ্ববর্তী একটি বাড়িতে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। এ সময় তার স্বামী এনজিও ম্যানেজার কামরুল ইসলাম আগেভাগেই পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যায়।
এর আগে, পুরাতন সাতক্ষীরার আনসার ভিডিপি ক্যাম্পের উত্তরপাশে অবস্থিত বিলাসবহুল বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ।
এনজিও’র কর্মী দেবহাটা উপজেলার খেজুরবাড়ীয়া পারুলিয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমানের মেয়ে রীনা পারভীনের সাতক্ষীরা থানায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ এনজিও পরিচালক আরিফা খাতুনকে গ্রেফতার করে।
মামলায় আরিফা খাতুনকে প্রধান করে ও তার স্বামী এনজিও ম্যানেজার কামরুল ইসলামকে আসামি করা হয়েছে। তাদের স্থায়ী ঠিকানা আশাশুনি উপজেলার কাকবাসিয়া গ্রামে। কামরুল ইসলামের বাবার নাম আবুল হোসেন।
মাছখোলা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক আরিফা খাতুন ও তার স্বামী কামরুল ইসলাম যোগসাজশ করে স্ত্রী আরিফা খাতুন স্কুল শিক্ষিকা হওয়া সত্ত্বেও নিয়মবহির্ভূতভাবে জেলা সাতক্ষীরা সমবায় অফিস থেকে ২০১১ সালে একটি সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির (এনজিও) রেজিস্ট্রেশন বাগিয়ে নেন। এনজিওর লাইন্সেস পেয়েই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয় নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় থেকে ঋণ ও লোন দেওয়া এবং ডিপিএস’র দুই থেকে তিনগুন টাকা দেওয়ার কথা বলে দুই শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন তারা।
এরপর থেকে আরিফা খাতুন ও তার স্বামী কামরুল ইসলামকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এক সময় যে সংসারে তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরাত, তারা এখন সাতক্ষীরা শহরের বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়িসহ কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। ব্যাংক একাউন্টেও রয়েছে কোটি টাকা।
মামলার নথিসূত্রে ও ভুক্তভোগী এবং থানা পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে জানা যায়, দেবহাটা উপজেলার খেজুরবাড়ীয়া পারুলিয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমানের কন্যা রীনা পারভীন এনজিওটিতে ২০১২ সালে মাঠ পর্যায়ে কর্মী হিসেবে যোগদান করেন। এরপর ওই এনজিও পরিচালক আরিফা খাতুন ও তার স্বামী ম্যানেজার কামরুল ইসলাম তার মাধ্যমে এনজিওর ডিপিএস’র মাধ্যমে তার দুই বোন পুলিশ সদস্য রত্না খাতুন ও ঝর্ণা খাতুন এবং হেনা খাতুন, রেজওয়ানা খাতুন, ইউসুপ আলী, আমেনা খাতুন, রেশমা খাতুন, ইমরান ও রফিকুল ইসলামসহ অনেকের কাছ থেকে ৬৪টি বইয়ের মাধ্যমে ৩৪ লাখ ৩৭ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। দীর্ঘ প্রায় ৪ বছর ডিপিএস’র মেয়াদ পূর্ণ হলেও তাদের ন্যায্য পাওনা টাকা বুঝিয়ে না দিয়ে বিভিন্নভাবে বিগত আওয়ামী লীগ নেতাদের ছত্রছায়ায় ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছিল। দিনের পর দিন গ্রাহকরা তাদের সাথে যোগাযোগ করে টাকা না পেয়ে ক্ষুদ্ধ হন।
এনিয়ে সাতক্ষীরা সদর থানায় কয়েক দফায় সালিশ হয়। একপর্যায়ে গত ২২ ফেব্রুয়ারি গ্রাহকদের পাওনা টাকা দিতে স্বীকার হয়ে তারা গ্রাহকের টাকা না দিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। একপর্যায়ে বহু হয়রানি ও লাঞ্ছনার স্বীকার হয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধার কন্যা রীনা পারভীন বাদী হয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা সদর থানায় মামলা দায়ের করেন।
এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাতক্ষীরা সদর থানার এসআই মহাসিন সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে অভিযান চালিয়ে এনজিও পরিচালক স্কুল শিক্ষিকা আরিফা খাতুনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাতক্ষীরা সদর থানার এসআই মহাসিন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, প্রায় দুই শতাধিক গ্রাহকের নিকট থেকে সঞ্চয় ও জমা দেওয়া ডিপিএস’র প্রায় তিন কোটি টাকা এনজিও পরিচালক আরিফা খাতুন ও তার স্বামী ম্যানেজার কামরুল ইসলাম আত্মসাৎ করেছে। এনজিও কর্মী ও ওই এনজিওর গ্রাহক রীনা পারভীনের দেওয়া লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করা হয়। উভয়পক্ষকে নিয়ে থানাতে বসা হলে তারা মামলাটি গ্রহণ না করার অনুরোধ জানিয়ে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিবেন বলে জানান। পরে তারা গ্রাহকের টাকা না দিয়ে বাদী পক্ষকে হুমকি-ধমকি ও লাঞ্ছিত করে স্বামী-স্ত্রী আত্মগোপনে চলে যান। এ ঘটনায় মামলা রেকর্ড হলে অভিযান চালিয়ে দুপুরে একটি বাড়ি থেকে এনজিও পরিচালক আরিফা খাতুনকে আটক করা হয়।
বিডি প্রতিদিন/এমআই