থাইল্যান্ডে বিমসটেক সম্মেলনের পর বাংলাদেশ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইনে ফেরত নেওয়ার ঘোষণা এলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এখনো রয়েছে নানান চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা এলেও দেওয়া হয়নি স্পষ্ট রূপরেখা। নিজ ভূখণ্ডে ফিরতে মরিয়া হলেও খাদ্য ও বাসস্থানের নিরাপত্তা ছাড়া রোহিঙ্গারা আদৌ ফিরবে কি না, সে বিষয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের আবাসভূমি রাখাইন এখন মিয়ানমার সরকারের দখলে না থাকায় রোহিঙ্গাদের ফেরাতে জান্তা সরকার কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে সে বিষয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ফেরাতে হলে মিয়ানমার জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই সে ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন যতটা সহজ মনে হচ্ছে ততটা না-ও হতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক কূটনীতিক ও সামরিক বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু বলতে গেলে এখন জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের আবাসস্থলের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ করছে আরাকান আর্মি। কিন্তু সরকার আলোচনা করছে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে। একই সঙ্গে আরাকান আর্মির সঙ্গেও আলোচনা করতে হবে। মিয়ানমারের ফেরত তালিকার অবস্থাও হযবরল। প্রত্যাবাসন নিয়ে নেই কোনো রোডম্যাপ। জানা মতে ফেরত নেওয়া রোহিঙ্গাদের আবাস্থল ও খাদ্যনিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। বলতে গেলে প্রত্যাবাসন এখনো অনিশ্চিত যাত্রা।’
ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘২০১৮ সালে আমরা মিয়ানমার সরকারকে ৮ লাখ রোহিঙ্গার একটি তালিকা দিয়েছি। ওই তালিকা থেকেই তারা কিছু রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার কথা বলছে। আমরা চেষ্টা করছি তালিকায় থাকা সব রোহিঙ্গাকে ফেরত দিতে। এখন মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে যেহেতু ঘোষণা এসেছে, আমাদেরও প্রস্তুতি রয়েছে তাদের ফেরত দেওয়ার।’
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানরাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, ‘আমাদের ঘরবাড়ি এখন আরাকান আর্মির দখলে। কিন্তু সরকার বলছে আমাদের ফিরিয়ে নেবে। এটা কীভাবে সম্ভব? সেফ জোন ও আমাদের ভিটেমাটি ফেরত দিলে রোহিঙ্গারা ফেরত যাবে।’
কুতুপালং ক্যাম্পের ১৪ নম্বর ব্লকের হেডমাঝি হামিদ হোছন বলেন, ‘আমরা অবশ্যই ফিরে যাব। না যাওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমাদের বসতভিটা এলাকা তো আরাকান আর্মির দখলে। কীভাবে যাব তা আগে জানা দরকার।’ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের খবরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন কুতুপালং এলাকার স্থানীয় মেম্বার হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার খবরে তাদের মাঝে উচ্ছ্বাস লক্ষ করা যাচ্ছে। রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে কথা বলেও একই রকম তথ্য পাওয়া গেছে।’
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর ৭ লাখ ৭৩ হাজার ৯৭২ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তবে রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের তথ্যমতে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার উপস্থিতি ছিল। ক্যাম্পগুলোয় প্রতি বছর ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্মগ্রহণ করছে। সে হিসেবে ছয় বছরে ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজারের মতো। এ ছাড়া ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী আরকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর যুদ্ধের জেরে রাখাইন থেকে পালিয়ে আসে আরও ১ লাখ রোহিঙ্গা। গত ছয় বছরে রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে সাড়ে ১৩ লাখের বেশি। জানা যায়, ২০২৪ সালের শুরুতে রাখাইন অঞ্চলে নতুন করে শুরু হয় মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে যুদ্ধ। চলতি বছরের শুরুতে এসে রাখাইনের সিংহভাগ এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে আরাকান আর্মি। তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া ভূমির সিংহভাগই একসময় ছিল বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল। যেখানে রয়েছে রোহিঙ্গাদের সহায়সম্পত্তি। কিন্তু সম্প্রতি জান্তা সরকার ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। আরাকান আর্মির দখলে থাকা ভূমিতেই রোহিঙ্গাদের ফেরানোর কথা বলছে জান্তা সরকার। অথচ বাংলাদেশের গলার কাঁটা হিসেবে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোয় রয়েছে সাড়ে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা। জান্তা সরকারের এ ঘোষণার পরপরই কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আলোচনার বিষয় এখন প্রত্যাবাসন ইস্যু। খাদ্য ও আবাসস্থলের নিশ্চয়তা ছাড়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন রোহিঙ্গা নেতারা। আরাকান আর্মির দখলে থাকা ভূমিতে জান্তা সরকার কীভাবে রোহিঙ্গাদের ফেরাবে তা নিয়েও দেখা দিয়েছে নানান প্রশ্ন। এর আগে ২০১৮ সালে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন আলোচনা শুরু করে বাংলাদেশ। ২০১৮-২০ সালে মিয়ানমার সরকারকে ছয় দফায় ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা দেয় বাংলাদেশ সরকার। এর মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরতযোগ্য মনে করছে জান্তা সরকার। এ ছাড়া চূড়ান্ত যাচাইবাছাইয়ের পর্যায়ে ৭০ হাজার রোহিঙ্গার নাম ও ছবি আরও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর বাইরে আরও সাড়ে ৫ লাখ রোহিঙ্গার যাছাইবাছায়ের কাজ জরুরি ভিত্তিতে করবে বলে জানায় জান্তা সরকার। ওই সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সরব ছিল এ ইস্যুতে। চীনের নেতৃত্বে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকসহ প্রত্যাবাসনের রূপরেখাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু করোনা প্রাদুর্ভাব এবং ইউক্রেনসংকট শুরু হলে কার্যত চাপা পড়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু।