রমজান মাসের মহত্ত্ব : রমজান মাসের দিনে আল্লাহতায়ালা রোজা ফরজ করেছেন এবং রাতে নফল নামাজ দিয়েছেন। এ মাসে যারা কোনো নফল কাজ করবে, সে অন্য মাসের ফরজ সমতুল্য বিনিময় এবং এ মাসের প্রতিটি ফরজ কাজে অন্য মাসের সত্তর গুণ ফরজ সমতুল্য বিনিময় লাভ করবে। (সহিহ ইবনে খুজাইমাহ-১৮৮৭)। এ মাসে জান্নাতের ফটকগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের ফটকগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানগুলোকে শিকল লাগানো হয়। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।
রোজার ফজিলত : রোজা পালনের মাধ্যমে তাকওয়া-খোদাভীতি ও পরহেজগারি অর্জন হয়। (বাকারাহ-১৮৩)। ইমান নিয়ে সওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোজাগুলো যে রাখে, তার পেছনের সব পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (বুখারি, মুসলিম)। আবু হুরায়রা (রা.) রসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহতায়ালা বলেন, আদম সন্তানের যাবতীয় আমলের বিনিময় দশ গুণ থেকে সত্তর গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে রোজা। কারণ রোজা আমারই জন্য, অতএব আমিই এর বিনিময়। (সহিহ মুসলিম)।
অসুস্থদের রোজার বিধান : নারীদের জন্য তাদের মাসিক পিরিয়ড ও প্রসবকালীন কিছু দিন রোজা রাখা নিষেধ। ওই সময়ে ছেড়ে দেওয়া রোজা রমজানের পরবর্তী কোনো সময়ে আদায় করে নেবে। যারা শরিয়তসম্মত সফর অথবা অসুস্থতাজনিত কারণে যা থেকে আরোগ্য লাভ করে রোজা আদায় করতে সক্ষম হবেন, তাদের জন্যও পরবর্তীকালে রোজা আদায় করা আবশ্যক। আর যদি অসুস্থ ব্যক্তি আরোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে কিংবা এমন বৃদ্ধ অবস্থায় পৌঁছে যান যার জন্য রোজা রাখার সক্ষমতা ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই, তাহলে ওই ব্যক্তি ফিদিয়া আদায় করবে। ফিদিয়ার পরিমাণ হলো, প্রতিটি রোজার জন্য একজন দরিদ্র ব্যক্তিকে দুই বেলা খাবারের ব্যবস্থা করা। অথবা প্রত্যেক রোজার জন্য সদকায়ে ফিতর সমপরিমাণ টাকা বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী গরিব, মিসকিনকে প্রদান করতে হবে।
রোজার নিয়ত : রোজার নিয়ত করা ফরজ। মনে মনে রোজা রাখার ইচ্ছা করলেই যথেষ্ট, নিয়ত মুখে বলা জরুরি নয়। ফরজ রোজার জন্য নিয়ত রাতেই করা উত্তম। সূর্য হেলার কিছু আগে নিয়ত করলেও হয়ে যাবে। প্রত্যেক রোজার জন্য নিয়ত পৃথক পৃথক করতে হবে। পুরো রমজান মাসের জন্য একত্রে নিয়ত করা যথেষ্ট নয়।
সাহরির ফজিলত : সাহরি খাওয়া সুন্নত, এতে বরকত আছে। সামান্য পানি পান করলেও সাহরির সুন্নত আদায় হবে। সুবহে সাদিকের কাছাকাছি সময় সাহরি খাওয়া মুস্তাহাব।
ইফতারের বিধান : সাহাবায়ে কেরাম (র.) দ্রুত ইফতার করতেন। আর বিলম্বে সাহরি খেতেন। ইফতার গ্রহণের সময় দোয়া, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার জন্যই রোজা রেখেছিলাম এবং আপনার রিজিক দ্বারাই ইফতার করলাম।’ (বায়হাকি)।
ইফতার করানোর ফজিলত : যে ব্যক্তি একজন রোজাদারকে ইফতার করাবে তার সব পাপ আল্লাহতায়ালা ক্ষমা করে দেবেন, পরকালে তাকে আগুন থেকে মুক্তি দান করবেন এবং তাকে রোজাদারের সমতুল্য বিনিময় দান করবেন। অথচ ওই রোজাদারের বিনিময়ে কোনো কমতি হবে না। একটি খেজুর, সামান্য পানি অথবা অল্প দুধের মাধ্যমে যে ইফতার করাবে আল্লাহতায়ালা তাকেও এ মহা বিনিময় দান করবেন। (সহিহ ইবনে খুজাইমাহ)।
যেসব কারণে রোজা ভেঙে যায় : রোজা অবস্থায় কোনো খাদ্যবস্তু, ওষুধ কণ্ঠনালি অথবা পায়ুপথে পেটে প্রবেশ করলে বা করালে রোজা ভেঙে যায়। সহবাস করা, ইনহেলার গ্রহণ করা ও নাকে ড্রপ দিয়ে ভিতরে টেনে নিলে, পায়ুপথে সাপোজিটর ব্যবহার করা হলেও রোজা ভেঙে যায়। (বাদায়েউস সানায়ে ২/৯৩)। রোজার কথা স্মরণ থাকাবস্থায় স্বেচ্ছায় শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মাদক বা তামাকের ধোঁয়া পেটে প্রবেশ করালে এবং ব্রাশ ও কুলি করার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে অসতর্কতাহেতু গলার ভিতর পানি চলে গেলে, হস্তমৈথুনে বীর্যপাত হলে, মুখে বমি চলে আসার পর ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেললে, রোজা অবস্থায় মহিলাদের পিরিয়ড আরম্ভ হলে, সুবহে সাদিকের পর সাহরির সময় আছে ভেবে পানাহার বা সহবাস করলে, ইফতারির সময় হয়েছে ভেবে সূর্যাস্তের আগে ইফতার করে নিলে, রোজা রাখা অবস্থায় ভুলবশত পানাহার করে রোজা নষ্ট হয়ে গেছে ভেবে আথবা অনিচ্ছাকৃত বমি হওয়ার কারণে রোজা নষ্ট হয়ে গেছে মনে করে ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করলে, এই রোজা কাজা করতে হবে।
যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না : রোজা অবস্থায় ইনসুলিন, স্যালাইন, গ্লুকোজ স্যালাইন ও যেকোনো ইনজেকশন শরীরে নিলে, রক্ত দিলে বা নিলে এবং নাকে অক্সিজেন নিলে, চোখে ড্রপ ব্যবহার করলে রোজা ভাঙবে না। আধুনিক গবেষণার আলোকে বলা যায়, কানে ড্রপ দিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে ২/৯৩, ফাতহুল কাদির ২/২৫৭, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ১/২০৪, ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া ২/৩৮)
লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা