দুই দিন আগে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে এক ব্যবসায়ী বন্ধুর সঙ্গে দেখা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী। বন্ধু একাধিক গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল কারখানার মালিক। অন্যরাও সমপর্যায়ের। আলাপে আলাপে জানতে চাইলাম কেমন আছেন ব্যবসায়ীরা? কেমন চলছে ব্যবসা? উত্তরে একজন বললেন, ‘ব্যবসায়ীরা কেমন আছি, তা মহান আল্লাহ ভালোই জানেন। তবে ব্যবসার বারোটা বেজে গেছে। এখন শুধু হাতে হারিকেন নেওয়া বাকি। ব্যবসার বারোটা বাজলেও দেশে-বিদেশে বাণিজ্য নাকি ভালোই চলছে।’ ভদ্রলোকের কথা শুনে আরও কিছু শোনার আগ্রহ জাগল। এরই মধ্যে আরেকজন নিচু স্বরে কিছু কথা বললেন। কথা বলার আগে তিনি তাঁর পেছনে ও আশপাশে চোখ বুলিয়ে নিলেন। বিষয়টি আমার দৃষ্টিগোচর হওয়ায় বললাম, কথা বলার আগে কি দেখলেন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘এখন সাবধানে কথা বলতে হয়। কখন কে কী শুনবে আর পতিত সরকারের দোসর হিসেবে একটা সিল মেরে দেবে। সে জন্যই একটু দেখেশুনে কথা বললাম।’ তারপর অন্য কথায় সবাই। তবে ‘ব্যবসার বারোটা’, ‘হাতে হারিকেন’, ‘দেশে-বিদেশে বাণিজ্য’ ও ‘সিলমারা’র মতো শব্দগুলো আমার ভাবনায় কাঠ ঠোকরার মতো ঠক ঠক করতে থাকল। আমিও আমার মতো করে হিসাবনিকাশ করছিলাম। সেই সঙ্গে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলাম, ‘হানিমুন পিরিয়ড কী শেষের পথে? দেয়ালে কান পাতার সময় কি এসে গেছে?
ব্যবসা ও বাণিজ্য দুটি শব্দ। শব্দ দুটির ব্যবহার একই রকম হলেও আভিধানিক অর্থ ভিন্ন। তাত্ত্বিক আলোচনাও ভিন্ন। ব্যবসা শব্দটির অর্থ ও পরিধি খুব বিস্তৃত। ব্যবসার ইংরেজি Business। সহজভাবে ব্যাখ্যা করলে মূলত ব্যবসা হলো কোনো পণ্য বা সেবা উৎপাদনের পর তা বিক্রি করে লাভ অর্জনের একটি প্রক্রিয়া। ব্যবসার কার্যক্রম শুধু পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রচলিত সব ধরনের অর্থনৈতিক কার্যকলাপের চালিকাশক্তি। এর লক্ষ্য শুধু লাভ করা নয়, সমাজ উন্নয়নে দায়িত্ব পালন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও অন্যতম উদ্দেশ্য। ব্যবসা একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ব্যবসার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি গতিশীল হয়, রাজস্ব আয় হয় এবং জীবনমানের উন্নয়ন হয়। অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তা নিজের পুঁজি খাটিয়ে একটি শিল্প স্থাপন করেন। শিল্পে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে মুনাফা করেন। অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেন। সরকারকে আয়কর দেন। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক দায়িত্বও পালন করেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৩ বছর হয়ে গেছে। পাকিস্তান আমলে ২২ পরিবারের মধ্যে ব্যবসাবাণিজ্য সীমাবদ্ধ ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিগত ৫৩ বছরে অনেক স্বনামধন্য শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব দেশে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন, যাঁরা দেশের উন্নয়ন এবং জাতীয় অর্থনীতির সমৃদ্ধি সাধনে অবদান রাখছেন। বিগত সরকারগুলো সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যর্থ হলেও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে দেশে হাজার হাজার শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে তাঁরা লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করেছেন। দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন। নারীর ক্ষমতায়ন করেছেন। গাজীপুর, আশুলিয়াসহ গার্মেন্ট শিল্পাঞ্চলে সকাল অথবা সন্ধ্যায় কর্মজীবী নারীর দীর্ঘ সারি দেখলে বিস্মিত হতে হয়। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করে এই নারীরা দেশের অর্থনীতির চাকা শক্ত হাতে ঘোরাচ্ছেন। গর্বের বিষয় হলো, আমাদের জিডিপির ৮৬ শতাংশ বেসরকারি খাতের অর্থাৎ শিল্পপতি, ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের অবদান। জিডিপির মাত্র ১৪ শতাংশ অবদান সরকারের। অথচ অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমলা বা কেরানি ছাড়া সরকারের কারখানা থেকে অন্য কোনো ‘পণ্য’ আপাতত তৈরি হচ্ছে না। সরকার একটি চিনিকলও ঠিকমতো চালাতে পারে না। বিশাল বিশাল জুট মিল বন্ধ হয়ে গেল। সরকারি টেক্সটাইল মিলগুলোরও একই অবস্থা। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কর্ণফুলী কাগজের কারখানার অবস্থাও খুব শোচনীয়।
তবে এটা সত্য, সরকারের সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া দেশের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা করা, শিল্প স্থাপন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা মানে নীতি সহায়তা প্রদান করা, ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া, শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করার জন্য জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ উপযুক্ত অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদান করলেই একজন ব্যবসায়ী দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। বিগত সময়গুলোতে সরকার দেশের বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তাদের কখনো কখনো সামান্য সহযোগিতা করেছে। তবে বেশির ভাগ সময়ই গালভরা আশ্বাস এবং নানাভাবে চাপ দিয়ে ক্ষমতায় থাকার জন্য সমর্থন আদায় করে দলভারী করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। সুবিধা দেওয়ার চেয়ে প্রচারণাই বেশি করা হয়। অতীতের সব সময়ের চেয়ে গত ১৫ বছর ব্যবসায়ীরা নানাভাবে বেশি চাপে ছিলেন। কোনো চাপ ছিল প্রকাশ্য, কোনোটি অপ্রকাশ্য। বিগত সরকার অনেক ব্যবসায়ীকে নানা চাপে রেখে অনেক সুবিধা আদায় করেছে। বিনিময়ে মুখে মুখে সব দেব- বলেও প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়ীরা তেমন কিছুই পায়নি। বরং বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। ভয়ে আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা তা প্রকাশ করতেন না। ৫ আগস্টের পর ব্যবসায়ীরা বুঝতে পেরেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ব্যবসায়ীদের কী ভয়াবহ ক্ষতি করেছে। সেই ক্ষতি এখন ব্যবসায়ীরা সামাল দিতে পারছেন না। ইতোমধ্যে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। লক্ষাধিক মানুষ বেকার হয়ে গেছেন। ব্যাংকের সুদহার বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো নতুন কোনো বেসরকারি বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংক এখন বন্ড ব্যবসায় অর্থ লগ্নি করছে। ডলারের দাম হু হু করে বাড়ছে। ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করে দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীব্যক্তিত্ব, এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার দেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী সংকটে ফেলে রেখে গেছে। বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেছেন, ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। হা’মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলতে বাধ্য হয়েছেন, আমি ব্যবসায়ী, এটা কি আমার অপরাধ? ব্যবসায়ীদের এসব কথায় দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসার প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশের বেসরকারি খাত নানামুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হলো আস্থা, নিরাপত্তা ও তারল্য সংকট। তারল্য সংকটের অন্যতম কারণ হলো, শিল্পে উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়া, ঋণের প্রবৃদ্ধি অনেক কম এবং ঋণের উচ্চ সুদহার। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা উত্তরণে ব্যবসায়ীরা সরকারের নীতি সহায়তা পাচ্ছেন না। মোট কথা, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ব্যবসায়ীদের বাস্তব পরিস্থিতি ভয়াবহ খারাপ। এই খারাপ পরিস্থিতি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে, ততই মঙ্গল। তা না হলে, কী হবে বলা মুশকিল। তবে এটুকু অন্তত অনুমান করা যায়, পেটে ভাত না থাকলে যেমন কারও হিতাহিত জ্ঞান থাকে না, তেমনি জাতীয় অর্থনীতি খারাপ হলে দেশের যারা প্রকৃত মালিক সেই জনগণেরও ধৈর্য ও সংযমের বাঁধ ভেঙে যেতে পারে।
তবে ওই সামাজিক অনুষ্ঠানে বাণিজ্য কথাটিও উঠেছিল। বাণিজ্যের আভিধানিক অর্থ একটু ভিন্ন। এর ইংরেজি Trade। অর্থাৎ এক স্থান থেকে পণ্য কিনে অন্য স্থানে বিক্রি করাই মূলত বাণিজ্য। যিনি বাণিজ্য করেন, তাকে বণিক বলা হয়। কিন্তু ওই ব্যবসায়ী ভদ্রলোক বাণিজ্যের বণিকদের কথা বলেননি। তিনি অন্য কিছু বলতে চেয়েছেন। কিছুটা বলেছেন, কিছুটা ঈঙ্গিত করেছেন। বাণিজ্য করার জন্য বণিকের নিজস্ব পুঁজি থাকতে হয়। সেই পুঁজি দিয়ে একজন বণিক এক স্থান থেকে পণ্য কিনে অন্য স্থানে বিক্রি করে মুনাফা করেন। কিন্তু ওই ব্যবসায়ী ভদ্রলোক যে বাণিজ্যের কথা বোঝাতে চেয়েছেন, তা করতে বণিকের পুঁজি একটু ভিন্ন। পুঁজি হলো, হয় নিজের ক্ষমতা অথবা মামা, চাচা, খালার ক্ষমতা। অর্থনৈতিক পুঁজি ছাড়া বাণিজ্য করে বিগত সরকারের সময়ে বহু লাল্লু পাঞ্জু শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছিল। তাদের টাকার গরম কমবেশি সবাই দেখেছে। সম্পদের তালিকা দেখে চোখ ছানাবড়া হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর সেই টাকাওয়ালারা অনেকে এখন দেশছাড়া, অনেকে আত্মগোপনে। চোখের সামনে এসব ঘটনা দেখার পরও নতুন বণিকরা নাকি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। শোনা যাচ্ছে, এখন নাকি পুত্রের ক্ষমতায় কিছু পিতা-মাতা ক্ষমতাবান হয়ে গেছেন। পুঁজি ছাড়া বাণিজ্য করার জন্য চেয়ার-টেবিল পেতে অফিসও নাকি খুলে বসেছেন। কেউ কেউ নাকি বিদেশে বসে বেশুমার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। যদি তা-ই হয়, তাহলে এতগুলো তাজা প্রাণ কেন ঝরল? কয়েক হাজার মানুষ কেন আজও হাসপাতালের শয্যায় কাতরাচ্ছেন।
মুরুব্বিরা সব সময়ই বলেন, সাবধান, দেয়ালেরও কান আছে। দেয়ালের কান কেউ দেখতে না পেলেও সতর্কতার জন্য এ প্রবচন প্রচলিত। তবে দেয়ালের ভাষা আছে। ওই ভাষা প্রকাশ্য। জুলাই বিপ্লবে বিপ্লবীদের ভরসার জায়গা ছিল ওই দেয়াল। বিপ্লবীরা তাঁদের ইচ্ছার কথা, তাঁদের ত্যাগের কথা, তাঁদের আকাঙ্ক্ষার কথা, দেয়ালের কাছেই সবার আগে বলতেন। দেয়াল বিপ্লবীদের পক্ষ নিয়ে বুক উঁচিতে দাঁড়িয়ে থাকত বিপ্লবীদের স্লোগান প্রচার করার জন্য। দেয়ালে দেয়ালে বিপ্লবীদের ভাষা স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বুঝদার, দায়িত্বশীল মানুষ দেয়ালের ভাষা পড়ার চেষ্টা করেন এবং সৃষ্টি হয় এক নতুন অধ্যায়ের। বিপ্লবীদের ভাষায় যাকে বলা হয়, ‘নতুন বাংলাদেশ’। বিপ্লবীরা নতুন বাংলাদেশকে সঠিক নিয়মে চালানোর জন্য কিছু মানুষের ওপর আস্থা রেখেছেন। কিছু মানুষের কাছে বিপ্লবীরা তাঁদের আমানত রেখেছেন। বিপ্লবীরা চেয়েছেন, দেশের মানুষ যেন ভালো থাকে। নিত্যপণ্যের দাম যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে। দেশের মানুষ যেন নিরাপদে থাকে। ব্যবসাবাণিজ্য, অর্থনীতি যেন সচল ও গতিশীল থাকে। যেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষাঙ্গন যেন হয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। জনগণের মৌলিক অধিকার যেন সমুন্নত থাকে। জনগণের দাবিগুলোই বিপ্লবীরা দেয়ালে দেয়ালে লিখেছিলেন।
ছয় মাস হতে চলল। একটু শক্ত করে বললে বলতে হয়, কেটে গেছে হানিমুন পিরিয়ড। এখন দেশের মানুষ এবং স্বয়ং বিপ্লবীরা দেয়ালের লেখাগুলো পড়তে শুরু করেছেন। দেয়ালে কান পেতে ভাষা বোঝার চেষ্টা করছেন। সুতরাং বিপ্লবীদের বিশ্বাসকে পুঁজি করে যাঁরা সরকারে আছেন, দয়া করে তাঁরা দেয়ালের লেখাগুলো পড়ুন। হিসাবের খাতা মিলিয়ে নিন। জনগণকে কী দেওয়ার কথা ছিল, কী দিলেন। দেয়ালে কান পাতুন। দেয়ালের ওপার থেকে চাপা স্বরের নানান শব্দ শুনতে পাবেন। মনে রাখবেন, সময়মতো জনগণ হিসাব মিলিয়ে নেবে। দুইয়ে দুইয়ে চার হয়, জনগণ তা জানে নিশ্চয়।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন