সকালবেলা আলী ছুটতে ছুটতে এলো। ভীষণ উত্তেজিত। হাঁপাচ্ছে। আমার হাত ধরে বলল, ‘চলো’। কোথায় যাব কী বৃত্তান্ত কিছুই জিজ্ঞেস করা হলো না। আলীর হাত ধরে ধূপখোলা মাঠ ভেঙে ছুটতে লাগলাম। আমরা পশ্চিম থেকে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে যাচ্ছি। এদিকটায় তিনটা বিশাল বিশাল শিমুলগাছ। তখন বোধ হয় চৈত্র মাস। শিমুলগাছে এত ফুল ফুটেছে, যেন গাছগুলোর মাথায় আগুন লেগে গেছে। সেদিকে তাকাবার সময় নেই। মাঠের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে ‘ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব’। ফুটবল ক্লাব হিসেবে খুবই বিখ্যাত। টিনের লম্বা দুটো ঘরে ক্লাব। ঘাসেভরা আঙিনা। অনেক পাতাবাহারের ঝাড়। জবা, হাসনাহেনা, কামিনী, শিউলির ঝাড়। সবুজ সুন্দর ঘাস। ক্লাব আঙিনার চারদিকে চটিবাঁশের বেড়া। ভারি স্নিগ্ধ-সুন্দর পরিবেশ। আমরা ছুটছি সেদিকে। কাঠের পুলের ওদিক থেকে সোজা রাস্তা এসে ক্লাবের পেছন দিয়ে ডান দিকে ঘুরে গেছে। সোজা দীননাথ সেন রোড।
মাঠের দক্ষিণ পাশটায় বেশ কয়েকটা বাড়ি। বাড়িগুলো রাস্তার ধারে। একটা বাড়ি কাঠের দোতলা সুন্দর ঘর। দোতলার ঝুল বারান্দা ধূপখোলা মাঠের দিকে। বাড়ির মেয়েরা বিকালের দিকে ওই বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করে। সামনের রাস্তায় বা মাঠে পায়চারি করে। ক্লাবের ঠিক পেছনেই রাস্তার ওপাশটায় বাঁশের বেড়া দেওয়া লম্বা মতো একটা ঘর। টিনের চালা। গেরুয়া পরা একজন সেখানটায় বসে থাকে। মাথায় লম্বা চুল খোঁপা করে বাঁধা। মুখে লম্বা দাড়ি-গোঁফ, রোগা, লম্বা। চোখ দুটো কোটরে। তাকে কখনো কারও সঙ্গে কথা বলতে দেখিনি। আপনমনে একা একা থাকে। হিন্দু সাধু। সেই সকালে আলী আমাকে সাধুর ঘরটার কাছে নিয়ে গেছে। ওই ঘরটাই হয়তো তার আখড়া। ভক্তটক্ত আছে কি না, ওই বয়সে আমার তা জানার কথা না। ঘর বা আখড়ার সামনে গিয়ে দেখি পাড়ার অনেক লোক ভিড় করে আছে। মহিলারা আছেন তাঁদের বাড়িঘরের সামনে। তাঁরাও জটলা করে কথাবার্তা বলছেন। ঘটনা কী? আলীর সঙ্গে ভিড় ঠেলে সামনে গেছি। গিয়ে আমার দম প্রায় বন্ধ হয়ে এলো। সাধু লোকটা ঘরের আড়ার সঙ্গে ঝুলছে। পা দুটো মাটি থেকে হাত খানেক ওপরে। মাথাটা ঝুলে আছে দরজার ঝাপের দিকে। মুখ থেকে জিবটা বেরিয়ে আছে বিঘতখানেক। সাধু গলায় দড়ি দিয়েছে। পরনে সেই গেরুয়া। ও রকম আরেক টুকরো কাপড় দিয়েই গলায় দড়ি দিয়েছে। গলায় দড়ি দেওয়া সাধুকে দেখে আমার মনে পড়েছিল মেদিনীমণ্ডল গ্রামের মণীন্দ্র ঠাকুর আর ধীরেন্দ্র চৌধুরীর কথা। ঘটনা ’৬৫ সালের। ঘোরতর বর্ষায় মণীন্দ্র ঠাকুর আর ধীরেন্দ্র চৌধুরীকে রাতের অন্ধকারে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছিল। পরদিন সকালে গ্রামের অনেকের সঙ্গে সেই লাশ দেখতে গিয়েছিলাম। মণীন্দ্র ঠাকুরের কথা আমার অনেক লেখায় লিখেছি। ‘যাবজ্জীবন’ উপন্যাসে আছে তাঁর কথা। ‘জীবনযাত্রা’ নামে গল্প লিখেছিলাম। সেই গল্প ছাপা হয়েছিল বিখ্যাত মনীষী হুমায়ূন কবীর প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকায়। ‘কেমন আছ, সবুজপাতা’ উপন্যাসে আছে তাঁর কথা। ‘নূরজাহান’ উপন্যাসে আছে।
আমি তখন কাজির পাগলা এ টি ইনস্টিটিউশনের ছাত্র। বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে পাকাপাকিভাবে ঢাকায় চলে এসেছি। ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়েছি গেন্ডারিয়া হাই স্কুলে। সাধুর গলায় দড়ি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল ’৬৬ সালের শুরুর দিকে। গলায় দড়ি দেওয়া ঝুলতে থাকা সাধুর দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দুজন মানুষের গলা কাটা লাশ দেখলাম। আরেকজনের দেখলাম গলায় দড়ি দেওয়া। তিনজনই হিন্দু। লেখালেখির জগতে ঢোকার পর অনেক দিন ইস্ট অ্যান্ড ক্লাবের ওদিকে হাঁটতে গিয়ে সেই সাধু মানুষটির কথা আমার মনে পড়েছে। কী দুঃখ ছিল মানুষটির? সাধু-সন্ন্যাসী ধরনের মানুষরাও কী আত্মহত্যা করেন? জীবনে আর কোনো ফাঁসিতে ঝুলতে থাকা মানুষ আমি দেখিনি। সিনেমা নাটকে দেখা অন্য কথা। বাস্তবে দেখিনি। আমার টুনু মামার বড় মেয়েটির নাম ছিল সেতু। অতি শান্ত নম্র স্নিগ্ধ চেহারার একটি মেয়ে। কথা বলত খুব কম। আমাকে খুব মান্য করত। আমার এই বোনটি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। দৃশ্যটি আমি সহ্য করতে পারব না বলে সেতুর লাশ দেখতে যাইনি। হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে বোনটির কথা। কোন বেদনায় এভাবে নিজেকে শেষ করল সেতু, কে জানে! মামা-মামির বয়স এখন আশির ওপর। তাঁরা আছেন কানাডায়। সেতু মারা যাওয়ার বেশ কিছু পর মামার ছেলেটিও মারা গেল। বয়স হয়তো চল্লিশ বছরও হয়নি। টুনু মামার ছোট মেয়েটির নাম শুভ্রা। আমি আর বীণা খালা দুজনে মিলে ওর বিয়ে দিয়েছিলাম। সে থাকে আমেরিকায়। স্বামী-সন্তান নিয়ে ভালো আছে।
দূর ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। গেন্ডারিয়ার দীননাথ সেন রোড। টুনু মামাদের বাড়ি। মা আমাদের নিয়ে জিন্দাবাহার থেকে এই বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। আমি ক্লাস টু বা থ্রিতে পড়ি। শীতকাল। খোকন মামা মিন্টু মামার সঙ্গে আমার বড় ভাই আজাদ আছে সারাক্ষণ। একদিন সকাল দশটা এগারোটার দিকে তারা প্ল্যান করেছে ধূপখোলা মাঠে যাবে। টুনু মামাদের বাড়িটা হচ্ছে সাধনা ঔষধালয়ের মাঝখানকার রাস্তাটি দিয়ে পূর্ব দিকের একেবারে শেষ মাথায়। রাস্তাটায় ঢুকলেই দুপাশে সাধনা ঔষধালয়ের কারখানা। ডান পাশে টিনের শেড দেওয়া বিশাল আঙিনা। সেখানে বস্তা বস্তা নানা রকমের শিকড়বাকড়, গাছের ডালপাতা, বাকল। অর্থাৎ আয়ুর্বেদীয় ওষুধ তৈরির জিনিস। পুরো এলাকা ভরে আছে গন্ধে। কারখানার ভিতর জ্বাল দেওয়া হচ্ছে ওষুধ। চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। পাশের ড্রেনে এসে পড়ছে অপ্রয়োজনীয় তরল। ড্রেন থেকেও ধোঁয়া উঠছে। আয়ুর্বেদীয় ওষুধের গন্ধে কেমন নেশা ধরে যায়। শেডের ছাদে পঞ্চাশ একশোটা বানর সব সময়ই বসে থাকে। রাস্তায় নেমে ছোটাছুটি করে। পাড়ার বাড়িঘরে গিয়ে হানা দেয়। রান্নাঘর থেকে খাবার নিয়ে যায়। সাধনা ঔষধলায়ের মালিক যোগেশচন্দ্র ঘোষ। তিনি বসেন রাস্তার বাঁ-দিককার দালানে। তাঁর একটা পাতালঘর আছে। সেই ঘরে বসে রিসার্চ করেন। তিনি একসময় জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপালও ছিলেন। টিন শেডের লাগোয়া পূর্ব পাশে কবরস্থান। বাড়িঘর প্রায় সবই টিনের। দু-চারটা দালানবাড়িও আছে। কিছু দূর এগিয়ে গেলে বাঁ-দিকে বিশাল একটা পুকুর। গাছপালা ঘেরা বাড়িঘর। চৌচালা টিনের ঘর আছে অনেক। অনেকটা বিক্রমপুরের গ্রামের বাড়িগুলোর মতো। শেষ মাথায় আমার নানাবাড়ির উত্তর পাশে একতলা পুরনো একটা দালানবাড়ি। বোধ হয় বনেদি কোনো হিন্দুবাড়ি ছিল। বাড়ির বাইরে সবুজ ঘাসের এক টুকরো মাঠ। মাঠ পেরিয়ে বাড়িতে ঢোকার মুখে খোলা একটা কামরা। সেই কামরাটির দুপাশে বাঁধানো বেঞ্চ। এই কামরাটিতে বোধ হয় বাইরের লোকজন এলে তাদের বসতে দেওয়া হতো। আমার দুই মামার সঙ্গে বড় ভাই যাচ্ছে ধূপখোলা মাঠে। আমিও তাদের পিছু নিলাম। সাধনা পর্যন্ত কাঁচা মাটির পথ। সাধনার ঠিক উল্টো দিকের রাস্তার পশ্চিম পাশে একতলা বিশাল একটি বাড়ি। প্রচুর আম আর নারকেলের গাছ। বেলগাছ আছে। জবা কামিনীর ঝোপ, লেবুঝোপ। ঝকঝকে সাদা উঠোন। ভারী কাঠের গেট। বেশ বনেদি বড় বাড়ি। ছাদের চারদিকে কারুকাজ করা রেলিং। ‘চক্রবর্তী বাড়ি’। এই বাড়ির ছেলে মানবেন্দ্র চক্রবর্তী। ডাকনাম খোকন। খোকনের সঙ্গে পরবর্তীকালে গভীর বন্ধুত্ব হয় আমার। গেন্ডারিয়া হাই স্কুলে আমরা একই ক্লাসে পড়তাম। শীতকালে প্রায় প্রতিদিন ওদের বাড়ির আঙিনায় ব্যাডমিন্টন খেলতাম। আমি, মুকুল, বুলু, বেলাল অনেক রাত খোকনদের সামনের ঘরে ঘুমিয়েছি। ওদের ছাদেও ঘুমিয়েছি। কত স্মৃতি সেই বাড়ি ঘিরে! অনেক লেখায় খোকনদের বাড়ির কথা আমি লিখেছি। খোকনের কথা লিখেছি।
সেই সকালে ধূপখোলা মাঠের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল আমি যেন এসে দাঁড়িয়েছি তেপান্তরের মাঠের সামনে। কী বিশাল মাঠ! মাঠের তিন দিকে বাড়িঘর। উত্তর দিকটা ফাঁকা। সেখানে আখের খেত। লম্বা লম্বা আখ আকাশের দিকে মাথা তুলে আছে। খেতখোলার ফাঁকে ফাঁকে ডোবানালা। উত্তর-পূর্ব পাশে কিছু দালানবাড়ি। কিছু টিনের ঘর। জায়গাটার নাম ‘নামাপাড়া’। এলাকার স্থানীয়দের বাস। এখন যেখানটায় বিখ্যাত ‘আজগর আলী হাসপাতাল’ সেই জায়গাটায়ও ছিল আখ খেত। বাংলাদেশের একটি অনেক বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের নাম ‘সিটি গ্রুপ’। এই সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমান সাহেবদের আদি বাড়ি নামাপাড়ায়। ‘আজগর আলী হাসপাতাল’ তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছেন। গেন্ডারিয়া ও আশপাশের এলাকার জন্য ‘আজগর আলী হাসপাতালের’ মতো অতি আধুনিক ও উন্নত মানের একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে তিনি অনেক বড় কাজ করেছেন। পুরান ঢাকার মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করবে।
’৬২-’৬৩ সালের সেই সকালের ধূপখোলা মাঠটি এখনো আমার চোখজুড়ে। শীতের রোদে ভরে আছে মাঠ। ইস্ট অ্যান্ড ক্লাবের লাগোয়া উত্তর পাশে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। সাদা পোশাক পরা ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। খোকন মামা, মিন্টু ুমামা আর আজাদ আসলে গিয়েছিল ক্রিকেট খেলা দেখতে। আমি ক্রিকেট খেলার কিছুই বুঝি না। ওদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখলাম। তারপর একা একা মাঠের এদিক ওদিক হেঁটে বেড়ালাম। এই ছিল আমার ধূপখোলা মাঠ দেখার প্রথম দিন। ঢাকায় পাকাপাকিভাবে চলে আসার পর ধূপখোলার মাঠ হয়ে উঠেছিল আমার খুব প্রিয় জায়গা। খেলাধুলা মোটেই পারি না। তারপরও বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে যাই ধূপখোলা মাঠে। এক দেড় ঘণ্টা দৌড়াদৌড়ি করে একবারও হয়তো পা দিয়ে বল ছুঁতে পারি না। শেষ দিকে বন্ধুরা আমাকে আর খেলায় নিত না। আলীও খেলতে পছন্দ করত না। পাড়ার অন্য ছেলেরা খেলত। আমরা দুজন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতাম। ধূপখোলা মাঠে তখন একসঙ্গে দশ-বারোটি টিম খেলতে পারত। খোলা মাঠখানিই যে যার মতো ভাগ করে নিয়েছিল। যে যার ভাগে খেলতে নামত। কখনো কখনো বড় বড় ম্যাচ হতো। ফাইনাল খেলার দিন প্যান্ডেল টানানো হতো। মাইকে বক্তৃতা আর ঘোষণা হতো। টেবিলের ওপর তিনটি বড় বড় কাপ সাজানো। গেন্ডারিয়ার মাতব্বর সর্দার বা চেয়ারম্যান সবই নামাপাড়ার। তাঁরা কাপ তুলে দিতেন বিজয়ীদের হাতে। খেলার সময় কখনো কখনো দুই দলে মারামারিও লেগে যেত। সর্দাররা এসে থামাতেন। হাবীব আর সাঈদ নামে দুই ভাই ছিলেন। দুজনেই ছয় ফুটের কাছাকাছি লম্বা। স্বাস্থ্যবান। সাদা লুঙ্গি আর শার্ট পরে সব সময় একসঙ্গে চলাফেরা করেন। দেখার মতো জুটি। গেন্ডারিয়ার লোকজন বেশ সমীহ করেন তাঁদের। নামাপাড়ার গিয়াসউদ্দিন চেয়ারম্যান সাহেব খুবই মানিলোক। বিচার সালিশে তাঁর খুব সুনাম ছিল। কারও প্রতি কোনো অবিচার তিনি করতেন না। এসব কথা পাড়ার মুরব্বিদের মুখে শুনতাম। আমার আব্বার সঙ্গে গিয়াসউদ্দিন চেয়ারম্যানের ভালো সম্পর্ক ছিল। একবার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে একজন সাইকেলচালক এসেছিল। তার নাম মোখতার আহমেদ আরসি। সে একটানা তিন দিন দুই রাত সাইকেল চালাবে। এক মিনিটের জন্যও সাইকেল থেকে নামবে না। এলাকার লোকজন ভিড় করে তার সাইকেল চালানো দেখল। শেষ দিন বিকালে প্যান্ডেল করে বড় আয়োজন। পুরস্কার হিসেবে তাকে বড় একটা কাপ দেওয়া হলো। টাকার মালা পরিয়ে দিলেন গিয়াসউদ্দিন চেয়ারম্যান। এ ঘটনার কথা আমি লিখেছিলাম ‘মায়ানগর’ উপন্যাসে।
‘ধূপখোলা’ নামটি এসেছে ‘ধোপা’ থেকে। মাঠের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে, একটু ভিতর দিকে ধোপাবাড়ি ছিল কয়েকটা। আমি যখনকার কথা বলছি, তখন ধোপাদের তেমন রমরমা নেই। তবু তারা বস্তা বস্তা কাপড় ধুয়ে ধূপখোলা মাঠে এনে শুকাতে দিত। নিশ্চয় বংশপরম্পরায় এ কাজটা চলে আসছিল বলেই মাঠের এই রকম নাম। তখন দুআনা ঘণ্টায় সাইকেল ভাড়া পাওয়া যেত। আলী সাইকেল ভাড়া নিয়ে চালাত। আমাকে শেখাবার চেষ্টা করেছিল। চালাতে গিয়ে কয়েকবার আছাড় খেলাম। হাত-পায়ের নুনছাল উঠে গেল। চালানোটা আর শেখা হলো না। ধূপখোলা মাঠে তখন অনেক ছাগল-ভেড়া চরত। গরুবাছুরও চরত। আমি একবার সাইকেল চালানো শিখতে গিয়ে কাত হয়ে সাইকেল নিয়ে পড়েছিলাম একটা ছাগলের ওপর। যার ছাগল সে তেড়ে মারতে এসেছিল। আমাকে নিয়ে আলী দৌড়ে পালিয়েছিল। এ মাঠেই আমি পেয়েছিলাম আমার জীবনের অতিপ্রিয় দুই বন্ধুকে। হামিদুল আর বেলাল। হামিদুল থাকত বানিয়ানগরে। বেলাল কলুটোলায়। হামিদুলের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল এক সকালে। আমার বয়সি ছেলেটি খুব স্বাস্থ্যসচেতন। সকালবেলা মাঠে হাঁটতে আসত। দৌড়াদৌড়ি করে ব্যায়াম করত। পকেটভর্তি ভেজা ছোলা নিয়ে আসত খাওয়ার জন্য। আমি দাঁড়িয়ে আছি শিমুলগাছগুলোর তলায়। নাদুসনুদুস ফুটফুটে সুন্দর একটি ছেলে এগিয়ে এলো আমার কাছে। রোদে উজ্জ্বল হয়ে আছে সকালবেলার ধূপখোলা মাঠ। ছেলেটি আমার কাছে এসে পকেট থেকে এক মুঠ ভেজা ছোলা বের করল। তার হাফপ্যান্টের দুপকেটই ভেজা। সেদিকে খেয়াল নেই। আমার দিকে ছোলা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘খাও’। এই ছেলেটির নাম হামিদুল। হামিদুলের কারণে পরিচয় হয়েছিল বেলালের সঙ্গে। হামিদুলদের চেয়েও অনেক বেশি অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে বেলাল। কে এল জুবিলী স্কুলে হামিদুলের সঙ্গে বেলালরা দুই ভাই পড়ে। বেলাল আর নেসার। বেলাল দেখতে হামিদুলের চেয়েও সুন্দর। রাজপুত্রের মতো। দামি সুন্দর জামাকাপড় পরে। কয়েক দিনের মধ্যেই এই দুজন আমার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠল। ধূপখোলা মাঠের কথা মনে হলেই সেই ছেলেবেলাটি আমি চোখের সামনে দেখতে পাই। আমার এই দুই প্রিয়বন্ধুর সঙ্গে আমার নিজের সেই সময়কার মুখটি দেখতে পাই। ধূপখোলা মাঠে পড়ে আছে আমার জীবনের অনেক সকাল-সন্ধ্যা, অনেক গোধূলিবেলা, আলো-অন্ধকারমাখা নির্জন রাত্রি, অনেক দুঃখবেদনা। আমার অনেক একাকী কান্নার সাক্ষী এই মাঠ।
লেখক : কথাসাহিত্যিক