ফিলিস্তিনের প্রধান অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নাবলুস নগরী। জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরের পবিত্র জেরুজালেম নগরী থেকে নাবলুসের দূরত্ব ৪৯ কিলোমিটার। নাবলুসকে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর স্মৃতিমণ্ডিত এলাকা বলে বিশ্বাস করা হয়। উল্লেখ্য, প্রতি বছর ঈদুল আজহায় আর্থিক সংগতিসম্পন্ন মুসলমানরা আল্লাহর রাহে পশু কোরবানি দেন। যার সঙ্গে হজরত ইব্রাহিমের স্মৃতিজড়িত। শুধু মুসলমান নয়, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কাছেও যিনি পরম শ্রদ্ধেয়। বিশ্বাসীদের আদি পিতা হিসেবে অভিহিত করা হয় হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে। খ্রিস্টান ও ইহুদিদের কাছে যিনি আব্রাহাম নামে পরিচিত। নমরুদের অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন ইব্রাহিম (আ.)। একেশ্বরবাদী ধর্মমতের পতাকা উড়িয়েছিলেন তিনি। বিশ্বাস করা হয়, ইব্রাহিম ছিলেন মূর্তি নির্মাতা পিতার সন্তান। কৈশোরের গণ্ডি পেরোনোর পর তাঁর মনে মূর্তিপূজার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মানুষের তৈরি মাটির মূর্তির কোনো ক্ষমতা নেই- এ তত্ত্ব তুলে ধরেন আল্লাহর এই প্রিয় নবী। ইব্রাহিমের এ ধর্মমতের জন্য কায়েমি স্বার্থবাদীরা তাঁর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। রাজা নমরুদের আক্রোশের শিকার হন তিনি।
নমরুদ ছিল স্বেচ্ছাচারী এক রাজা। ক্ষমতার বড়াই করত সে। নিজেকে স্বয়ং ঈশ্বর বলে দাবি করত। ইব্রাহিম রাজার এ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেন। মূর্তিপূজা এবং রাজার ঐশ্বরিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিপ্লবাত্মক বক্তব্য রাখার দায়ে আল্লাহর এই নবীকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, সে অগ্নিকুণ্ড থেকে বেঁচে যান ইব্রাহিম (আ.)। আল্লাহ তাঁর এই প্রেরিত পুরুষকে রক্ষা করেন রাজা নমরুদের কবল থেকে।
অত্যাচারী রাজার বিরুদ্ধে হজরত ইব্রাহিম যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তাতে যোগ দেয় সে দেশের নিপীড়িত মানুষ। তাঁর একেশ্বরবাদী ধর্মচিন্তা ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ক্ষমতাদর্পী রাজা নমরুদ এ প্রেক্ষাপটে আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
ইব্রাহিমকে বলে, সাধ্য থাকলে তোমার আল্লাহ আমার মোকাবিলা করুক। আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উন্মুক্ত প্রান্তরে সমবেত হয় নমরুদ বাহিনী। ধর্মীয় বিশ্বাসমতে, আল্লাহ নমরুদের ক্ষমতার দর্প নস্যাৎ করতে পাঠিয়ে দেন মশক দল। অগণিত মশা নমরুদ বাহিনীর ওপর চড়াও হয়। একটি মশা নমরুদের নাকের ভিতর দিয়ে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে হুল ফুটাতে থাকে। যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে নমরুদ তার সৈন্যদের নিজের মাথায় আঘাত করার নির্দেশ দেয়। তাতেই প্রাণ হারায় এই পাপিষ্ঠ। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বিশ্বাস নাবলুসের জিরজিম পর্বতে আল্লাহর প্রিয় নবী তাঁর একমাত্র সন্তানকে স্রষ্টার উদ্দেশে কোরবানি দিতে চেয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসেও নাবলুসের রয়েছে অন্যরকম মর্যাদা। খ্রিস্টানদের সঙ্গে মুসলমানদের ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেডের সময় নাবলুসের জিরজিম পর্বতে মুসলিম সুলতান সালাহউদ্দিন পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করেছিলেন। সে টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষ আজও বিদ্যমান।
আধুনিক ইতিহাসেও নাবলুসের রয়েছে অন্যরকম মর্যাদা। বিবিসির সংবাদ ভাষ্যে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদ বিকাশ লাভ করেছিল ঐতিহ্যবাহী নাবলুস শহরকে ঘিরে। ইসরায়েল সৃষ্টির ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল ফিলিস্তিনের এই শহর থেকেই। এখনো পর্যন্ত প্রতিবাদী ভূমিকার ক্ষেত্রে এ শহরের বাসিন্দাদের ভূমিকা অনন্য। নাবলুসের বালাতা শরণার্থী শিবির ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের বিশ্বস্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত।
একসময় নাবলুস ছিল ফিলিস্তিনের সব কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। সেই নাবলুস শহর এখন অনেকটাই নির্জীব। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত বলেছিলেন, ফিলিস্তিন স্বাধীন হলে নাবলুস হবে দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী। আরাফাতের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। ইসরায়েলি দখলদারত্বের কারণে নাবলুসের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। একসময় ফিলিস্তিনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ এলাকা বলে পরিচিত নাবলুস আজ হতশ্রী। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার পর থেকে অর্থাৎ ২০০০ সাল থেকেই ইসরায়েলিদের কঠোর অবরোধে নাবলুস অবরুদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক কোন্দল এবং পশ্চিমা সাহায্য বন্ধ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। নাবলুস নগরীতে বিনিয়োগের জন্য মুখিয়ে থাকতেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের অন্তঃকোন্দল পিএল ও হামাসবিরোধী এবং ইসরায়েলি হামলা ও অবরোধের কারণে বিনিয়োগকারীরা নাবলুসের প্রতি উৎসাহ হারিয়েছে। গাজায় হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাতের সময় বিনা উসকানিতে পশ্চিম তীরেও ধরপাকড় চালানো হয়েছে। ফলে যারা নাবলুসে বিনিয়োগ করতেন তারা এখন জর্ডান, আরব আমিরাতের দিকে চলে যাচ্ছেন। ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনিদের ভাতে মারার জন্য নাবলুসে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর স্মৃতিমণ্ডিত জনপদ নাবলুসকে তারা কার্যত একটি কারাগারে পরিণত করেছে। ইসরায়েলিরা এই নবীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে নিজেদের পরিচয় দেয়। এর চেয়ে প্রহসন আর কী-ই বা থাকতে পারে।
লেখক : প্রাবন্ধিক