সাভারের বিরুলিয়ায় গিয়েছিলাম একটা প্রতিবেদনের দৃশ্য ধারণ করতে। তখন ডিসেম্বর মাস। ফেরার পথে গোলাপ গ্রাম হয়ে এলাম। খুব দ্রুতই পাল্টে যাচ্ছে সেখানকার চিত্র। খণ্ড খণ্ড কৃষিজমি আরও খণ্ড খণ্ড হয়ে যাচ্ছে। অনুচ্চ বাউন্ডারি তৈরি করে বানানো হচ্ছে আবাসন প্লট। কিন্তু এখনো নতুন আবাসিক শহর রূপ লাভ করেনি। বলা চলে এখানকার বিদায়ি কৃষি হিসেবে সৌন্দর্য বর্ধন করে চলেছে ফুল। বিশেষ করে গোলাপ।
পৌষের মিষ্টি রোদ, দুপুর গড়ানো বিকালে এক আনন্দমুখর এলাকা হয়ে উঠেছে ঢাকার কাছাকাছি এ প্রাকৃতিক পর্যটনক্ষেত্র। অনেক কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী ফুলের সৌন্দর্যের কাছাকাছি এসে প্রাকৃতিক সৌরভ গ্রহণ করছে। মাঠের কোনায় এখানে-সেখানে বসেছে ফুলের দোকান। কিশোরী-তরুণীরা সেখান থেকে ফুলের মুকুট মাথায় দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
দৃশ্যপট অনেকটা যশোরের ঝিকরগাছার গদখালির মতোই। গদখালির মাঠগুলোও তখন ফুলে পূর্ণ। নতুন বছরকে সামনে রেখে ফুলবাণিজ্যের হিসাব কষেছিলেন ফুলচাষিরা। পরপর দুই বছর লোকসানের পর এবার তারা তাদের চাষ ও বাণিজ্য নিয়ে অনেকটা স্বাভাবিক জায়গায় ফিরতে পেরেছেন। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। বর্তমান বাজারব্যবস্থা নিয়ে খুশি ফুল বিক্রেতারা।
সাভারের এই বিরুলিয়া এলাকায় ফুলচাষি রয়েছেন তিন শতাধিক। ঢাকার এত কাছাকাছি তাদের ফুল চাষকেন্দ্রিক কৃষিবাণিজ্য রীতিমতো সম্প্রসারিত হচ্ছে। শ্যামপুর, কমলাপুর, বাগীবাড়ি, সাদুল্লাহপুরসহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখলাম, চাষিদের মধ্যে অনেকেই ফুলবাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত আবার কেউ কেউ বিক্রির জন্য ফুল তুলছেন। দর্শনার্থীদের আনাগোনাও অন্যান্য সময়ের তুলনায় ছিল বেশি। একজন চাষি একমনে ফুল তুলছিলেন। লক্ষ করলাম, ফুল তোলার ক্ষেত্রে কোনো সুরক্ষা তার হাতে নেই। কথা বললাম তার সঙ্গে। নাম বাদল। জানতে চাইলাম, ‘বাদল, আপনি যে ফুল তুলছেন, গ্লাভস পরে নিলে ভালো হতো না?’
‘ওইতা লাগে না। ওগুলো পরে কাজ করতে ভেজাল লাগে।’ বাদলের সহজসরল উত্তর।
বললাম, ‘দেখি, আপনার হাত দুটি দেখি।’ হাতের ফুল রেখে দুটি তালু মেলে ধরলেন বাদল। অসংখ্য কাঁটার আঘাতের চিহ্ন দুই হাতের তালুতে ভরে আছে। সেই ক্ষতগুলোতে হাত বুলিয়ে বললাম, ‘এইগুলো কী তবে?’ বললেন, ‘কাঁটা বিঁধলে পেকে গিয়ে বের হয়ে যায়। কোনো ইনফেকশন হয় না।’
‘আপনাকে কে বলেছে ইনফেকশন হয় না! গ্লাভস পরে কাজ করলে বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবেন।’ আমার কথায় গ্লাভস পরে কাজ করবে বলে জানালেন বাদল। তিনি অন্যের গোলাপ বাগানে কাজ করেন। সকাল ৭টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত কাজ করে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। তার নিজেরও দুই বিঘা জমিতে গোলাপের বাগান আছে। করোনার দুঃসময়ের কথা স্মরণ করে বাদল বললেন, ‘আয়-রোজগার বলতে সে সময় কিছুই ছিল না। বাগানের ফুল বাগানেই নষ্ট হইছে। তবে এখন আবার আয়-রোজগার হইতাছে। বাজারও ভালো যাইতাছে।’
জানতে চাইলাম, আজকে গোলাপের বাজার কত? বললেন, ৫ টাকা পিস যাচ্ছে আজ।
বাদল জানালেন, ভালোবাসা দিবসে ফুলের সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে। দামটাও ভালো পান। এ ছাড়া পয়লা জানুয়ারি, নববর্ষ, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস- এমন জাতীয় দিবসগুলোতে ফুলের বাজার থাকে ভালো।
বাদলকে বললাম, ফুলচাষিদের স্বাস্থ্যগত বেশ কিছু বিষয় মেনে চলা উচিত। কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের সময় মাস্ক, দস্তানা ও সুরক্ষিত পোশাক পরা উচিত এবং ব্যবহারের পর হাত-মুখ ভালোভাবে ধুতে হবে এবং কাপড় পরিবর্তন করতে হবে। কীটনাশক প্রয়োগের সময় বাতাসের দিক বিবেচনা করে স্প্রে করতে হবে। দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ করার ফলে শরীর পানিশূন্য হতে পারে, তাই নিয়মিত পানি পান করা জরুরি। তীব্র গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি ও লবণযুক্ত পানীয় খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। হাত ও পা ভালোভাবে ধোয়া উচিত, বিশেষত কীটনাশক ও মাটি স্পর্শ করার পর। ফুলবাগান বা জমিতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা প্রয়োজন, যাতে রোগজীবাণু কম থাকে। সকাল বা বিকালে কাজ করা ভালো, তীব্র রোদে কাজ করা এড়িয়ে চলা উচিত। দীর্ঘক্ষণ ঝুঁঁকে কাজ করার ফলে কোমর বা পিঠের ব্যথা হতে পারে। ভারী কাজের পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে।
ঘুরতে ঘুরতে গেলাম গোলাপ গ্রামের আরেকটি গোলাপখেতে। খেতের মালিক আবদুল বারেক। বারেক স্থানীয় একজন চাষি। কৃষক পরিবারের সন্তান। চোখের সামনে কৃষিনির্ভর এ এলাকার বহুমুখী পরিবর্তন দেখেছেন তিনি। ৯০ শতাংশ জমিতে তার ফুল চাষ। বারেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গোলাপবাগানের জমিটি তিনি বাণিজ্যিক প্লট ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতেই কৃষিকাজ করছেন। এখানে যতদিন নির্মাণকাজ শুরু না হচ্ছে ততদিন বিনা ভাড়ায় চাষাবাদের সুযোগ পাচ্ছেন বারেক।
তার কাছে জানতে চাইলাম, ‘এখন তো গোলাপ চাষ করছেন। যখন এখানে নির্মাণকাজ শুরু হবে তখন কী করবেন?’ ভবিষ্যৎ কী জানেন না বারেক। মনে হলো জানতেও চান না। বর্তমান নিয়ে সন্তুষ্ট তিনি। ফুলের বাজার ফিরে এসেছে। ‘ফুল না থাকলে আর কোনো ব্যবসা খুঁজে নিতে অইবো।’ নীরস উত্তর বারেকের। ‘এখন ফুলই ধ্যানজ্ঞান। ভালো ফলন হইছে এবার। দামও ভালো।’ খুশিতে চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার। বারেকের বিবেচনায় অভাবনীয় এক লাভজনক কৃষি হচ্ছে গোলাপ চাষ। গাছ রোপণের পরের মাস থেকেই ফুল ধরতে শুরু করে। তারপর শুধু ফুল তোলা আর বিক্রি।
এখানে ফুলের চাষ ঘিরে সারা বছরের একটি পর্যটনশিল্পও বেশ জমে উঠেছে। শীত মৌসুমই পর্যটনের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ ফুলের চাষ এলাকায় তখন পর্যটনেরই পরিবেশ বিরাজ করছে। শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সি নারী-পুরুষ আসছেন। সেই সঙ্গে জমে উঠেছে ছোটখাটো বাণিজ্য। বারেকের খেতের পাশেই ফুল বিক্রি করছিলেন এক বৃদ্ধ। ফুল কিনতে এসেছিল তিন তরুণী। কলেজের ছুটিতে তিন বন্ধু এখানে বেড়াতে এসেছে। কথা বললাম তাদের সঙ্গে। গোলাপ গ্রামের কথা অনেক শুনেছে তারা। এবারই প্রথম দেখতে এলো। একজন বলল, ‘ইউটিউবে গোলাপ গ্রাম নিয়ে আপনার অনুষ্ঠানও দেখেছি স্যার।’ আমি হাসলাম, জানতে চাইলাম, টিভি দেখ না। বলল ‘টিভিতেও দেখি, ইউটিউবে বেশি দেখি। মোবাইল ফোনে দেখা যায়।’ প্রযুক্তিপ্রেমী তরুণ-তরুণীদের হাতের ফোনটিই এখন সব ধরনের যোগাযোগ ও বিনোদনের প্রধান মাধ্যম।
এ এলাকায় ফুলের চাষ সম্প্রসারিত হওয়ায় স্থানীয় কৃষিশ্রমিকদের সারা বছরের কাজ নিশ্চিত হয়েছে। মাঠে কাজ করছিলেন দুজন নারীশ্রমিক। কথা বলে জানা গেল, এখানে তাদের নির্ধারিত মজুরিও বেশ সন্তোষজনক। ফুলকে ঘিরে একটা অর্থনৈতিক বলয় এখানে গড়ে উঠেছে। ফুলই হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের অনেক মানুষের নির্ভরতার ক্ষেত্র।
আমাদের বৈচিত্র্যময় কৃষিতে ফুল এক অসাধারণ সংযোজন। এটি আমাদের রঙিন অর্থনীতি। দেশের বহু কৃষক ও তৃণমূল উদ্যোক্তার ভাগ্য উন্নয়নে ফুলের চাষ অভূতপূর্ব অবদান রেখেছে। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি, পানিসারাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামসহ ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গার অনেক অংশে এখন ফুলের চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার সাভারও ফুলচাষের এক অনন্য ক্ষেত্র। এখানে ফুল চাষের পরিধি সম্প্রসারিত হচ্ছে দিনের পর দিন। বাড়ছে বাজারের পরিধি।
করোনার দুই বছর লোকসান গুনলেও ফুল চাষ ও বাণিজ্যে আবার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসায় নতুন আশায় বুক বেঁধেছেন চাষিরা। তাদের বিশ্বাস জনজীবন স্বাভাবিক থাকলে ফুল চাষের গতি ও সমৃদ্ধি বাড়তেই থাকবে। ফুলের সৌরভে ভরে উঠবে তাদের জীবন।
লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব