বিশ্বসেরা পুলিশ বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের এনওয়াইপিডি। এ দক্ষ বাহিনীতে ২১ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন শামসুল হক। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি তিনি উজ্জ্বল করেছেন। তাঁকে দেখে আরও অনেকে এনওয়াইপিডিতে যোগদানে অনুপ্রাণিত হন। বহুজাতিক এ বাহিনীতে প্রথম দক্ষিণ এশিয়ান এবং প্রথম মুসলিম লে. কমান্ডার তিনি। সম্প্রতি অবসর গ্রহণ করেছেন। এখন ‘রাইজিং আপ নিউইয়র্ক’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারায় নিজেদের হিস্সা আদায়ের ক্ষেত্র প্রসারিত করার জন্য ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত এবং সবাইকে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্যও কাজ করছেন তিনি...
এনওয়াইপিডিতে দীর্ঘ ক্যারিয়ার শেষে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার হিসেবে ১ মার্চ অবসর নেওয়া বাংলাদেশি আমেরিকান শামসুল হক বলেন, প্রতিটি দিন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। ধৈর্য, সততা এবং টিমওয়ার্কের শক্তি সম্পর্কে মূল্যবান শিক্ষাও দিয়েছে। আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বের অনন্য এক বাহিনীর সেরা সদস্যদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। বিভিন্ন ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের অফিসাররা আমাকে আপন করে নিতে ভোলেননি, যা অবশিষ্ট জীবনে আমার জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। আর এভাবেই বহুজাতিক এই সিটি তথা আমেরিকার মানবিক-সামাজিক মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটেছে সর্বস্তরে। আমেরিকান স্বপ্ন পূরণের পথে যে কজন বাংলাদেশি নিজ যোগ্যতার বলে সাফল্যের দেখা পেয়েছেন তাঁর একজন সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর বাঘা ইউনিয়নের গৌরাবাড়ি গ্রামের মরহুম আবদুল মুছাব্বিরের ছেলে শামসুল হক।
দীর্ঘ ২১ বছর পুলিশ বিভাগে অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি তিনি উজ্জ্বল করেছেন। তাঁকে দেখে পরবর্তীতে আরও অনেকে এনওয়াইপিডিতে যোগদানে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
শামসুল হকের পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পথ ছিল ব্যতিক্রমী। উচ্চ বিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছাড়াই নিউইয়র্কে আগত শামসুল হক কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজের জন্য একটি সুদৃঢ় ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি উচ্চশিক্ষায়ও বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেন। তিনি বারুক কলেজ থেকে ব্যবসা-প্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি (বিবিএ) অর্জন করেন। পরে সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট সিনেটের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি বিশ্বখ্যাত কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে মাস্টার্স ডিগ্রি (এমপিএ) লাভ করেন। এনওয়াইপিডিতে তাঁর কর্মজীবন ছিল সততা, পেশাদারি এবং কর্তব্যপরায়ণতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি রাস্তায় টহল পুলিশ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে জবাবদিহিতার বিষয়গুলো তদারকি করেছেন। তাঁর দৃঢ় মনোবল এবং কর্তব্য নিষ্ঠার জন্য তিনি সহকর্মী ও কমিউনিটির মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। অবসরের সময় তিনি নিজের ইউনিটের সিনিয়র লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ছিলেন।
এনওয়াইপিডি থেকে অবসর নিলেও নিউইয়র্ক এবং নিজ জন্মভূমির মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অটুট থাকবে বলে জানান শামসুল হক। বহুজাতিক এ বাহিনীতে প্রথম দক্ষিণ এশিয়ান এবং প্রথম মুসলিম লে. কমান্ডার শামসুল হক বলেন, ‘আমি আমার কর্মজীবনে তদন্ত, জননীতি, বিভাগীয় ব্যবস্থাপনা এবং রাজনীতিক ও কমিউনিটির লোকজনের সহযোগিতার মাধ্যমে আপামর জনতার আস্থা বৃদ্ধি ও তা অটুট রাখতে কাজ করেছি। সততা বজায় রাখা এবং জননিরাপত্তা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েছি। শামসুল হক বললেন, আমার জীবনে অনেক অর্জনের অন্যতম হচ্ছে এনওয়াইপিডিতে কর্মরত বাংলাদেশিদের সমন্বয়ে ২০১৫ সালে ‘বাপা’র (বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন) প্রতিষ্ঠা এবং পুলিশ কমিশনারকে নিয়ে দুটি টাউন হল মিটিংয়ের আয়োজন করি যেখানে ৫ শতাধিক প্রবাসী অংশ নিয়েছেন। পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কমিউনিটির সম্পর্কের পরিধি বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে তা অপরিসীম অবদান রেখেছে বলে মনে করছি।
কমিউনিটির উন্নয়নের জন্য ইতোমধ্যেই তিনি কাজ শুরু করেছেন। ‘রাইজিং আপ নিউইয়র্ক’ নামক একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন তিনি। মূলধারায় নিজেদের হিস্সা আদায়ের ক্ষেত্র প্রসারিত করার জন্য ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত এবং সবাইকে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য কাজ করছেন তিনি। এ প্রক্রিয়াটিকে অনেকেই মৌলিক একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে মনে করছেন। কারণ আমেরিকান স্বপ্ন পূরণে মূলধারায় সম্পৃক্ততার বিকল্প নেই। নিউইয়র্ক সিটিতে কয়েক লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন। এর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ইতোমধ্যেই সিটিজেনশিপ গ্রহণ করলেও ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হননি। অর্থাৎ তারা নাগরিক হিসেবে ন্যায্য অধিকার আদায়ে সক্ষম হচ্ছেন না। শামসুল হক কমিউনিটির প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানেই হাজির হচ্ছেন। সিটিজেনদের ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে শামসুল হক বলেন, আমরা চাই আগামী ৫-৭ বছরের মধ্যে কমিউনিটির লোকজন সিটি, স্টেট এবং ফেডারেল পর্যায়ের নির্বাচনে জয়ী হোক। তাহলে আমাদের নতুন প্রজন্মের পথও সুগম হবে মূলধারায় অধিষ্ঠিত হতে। শামসুল হক উল্লেখ করেন, যাকে খুশি তাকে ভোট দিন, কোনো সমস্যা নেই। ব্যালটযুদ্ধে অবতীর্ণ হলেই নিজেদের হিস্সা আদায়ের পথ সুগম এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে কমিউনিটির গুরুত্ব বাড়ে। ১৪ বছর এবং ৯ বছর বয়সি দুই স্কুলগামী ছেলে এবং স্ত্রীকে নিয়ে কুইন্সে বসবাসরত শামসুল হক ইতোমধ্যেই ‘রাইজিং আপ নিউইয়র্ক’র ব্যানারে কয়েক হাজার প্রবাসীকে ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছেন। এ কাজটিকেই তিনি তার প্রধান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তার সর্বকনিষ্ঠ ভাই বদরুল হক যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ বিভাগের একজন কর্মকর্তা। শামসুল হকের অবসরগ্রহণ এবং পুলিশ অফিসার মাহবুবুর জুয়েলকে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের মুসলিম অফিসার সোসাইটি থেকে সম্মানিত করা হয়েছে। সিলেটের এই দুই কৃতী সন্তান বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য।