শারমিন ফারহিন। বয়স সবে ৩০। বেশ কিছু দিন ধরে প্রশ্রাবের সময় ব্যথা অনুভব করেন। প্রথমদিকে বিষয়টিকে পাত্তা দেননি। বিলম্ব করেই যান চিকিৎসকের কাছে। ততদিনে তার জরায়ুমুখ ক্যান্সার মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যা অনেকটা চিকিৎসা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এভাবে বিলম্বে চিকিৎসা শুরুর কারণে অনেকেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদন্ডদুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, জরায়ুুমুখ ক্যান্সারের প্রধান সমস্যা হলো এটি শেষ পর্যায়ে গেলেই শুধু ব্যথা দেখা দেয়। এটিই জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ভয়ংকর চরিত্র, বৈশিষ্ট। প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণগুলোকে অনেকেই মেয়েদের মেয়েলি সমস্যা বলে মনে করেন। ক্যান্সার যখন একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে যায় তখন রোগটা অনেক দূর ছড়িয়ে যায়।
প্রতি বছর জানুয়ারি মাসজুড়ে চলে জরায়ুমুখ ক্যান্সার সচেতনতা মাস। চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো এ নিয়ে নানা কর্মসূচি পালন করে চলেছে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- ‘আমরা জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ করব’।
জানা যায়, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২২ সালের শেষদিক থেকে ভ্যাকসিন প্রদান শুরু হয়। গতকাল পর্যন্ত সেখানে ৪০৯ জনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। তা ছাড়া গত ১ বছরে ২৬০ জনের স্ক্রিনিং করা হয়। এর মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যান্সার পজিটিভ শনাক্ত হয়। এখানে প্রতি মাসে ২০-২৫ জন স্ক্রিনিং করতে আসেন।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা চৌধুরী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যান্সার নির্মূল। সংস্থাটির বার্তা হলো- ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সি ৯০ শতাংশ কিশোরীকে ভ্যাকসিন দেওয়া এবং ৭০ শতাংশ নারীকে স্ক্রিনিং করা। কারণ, জরায়ুমুখ ক্যান্সার রোগটি চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই সহজ। আর প্রতিরোধের প্রধান মাধ্যম হলো স্ক্রিনিং এবং ভ্যাকসিন গ্রহণ করা।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করতে পারলে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে রোগীরা এই রোগ নিয়ে চিকিৎসা গ্রহণে অনেকেই অনাগ্রহী। এ কারণে অধিকাংশ রোগীই বিলম্বে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে এ চিকিৎসার সুফলও পান না।
জানা যায়, জরায়ুমুখ ক্যান্সারের জন্য দায়ী হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)। সরকার জরায়ুমুখ ক্যান্সার নির্মূলে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের ৫১২টি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জরায়ুমুখ ক্যাান্সার স্ক্রিনিংও করা হয়। বিশ্বব্যাপী নারীদের ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যু হারের দিক থেকে চতুর্থ স্থানে জরায়ুমুখ ক্যান্সার এবং বাংলাদেশে এর স্থান দ্বিতীয়। জরায়ুমুখ ক্যান্সার ৩৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সি নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
বিশ্বব্যাপী জরায়ুমুখ ক্যান্সারের মৃত্যু হারের ৯০ শতাংশই ঘটে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল, মধ্যম আয় এবং অনুন্নত দেশগুলোতে।
১০০টিরও বেশি প্রকার বা স্ট্রেন আছে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের। এর মধ্যে ১৪ থেকে ১৫টি হচ্ছে হাই রিস্ক স্ট্রেন। এইচপিভি ভাইরাসের মাধ্যমে জরায়ুমুখে ক্যান্সার হয়। এই ভাইরাসের বিরুদ্ধেই টিকাটি আবিষ্কার হয়েছে।