শিক্ষা আইন প্রণয়নে ২০১১ সালে উদ্যোগ নেয় পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। ১৪ বছর পার হলেও দফায় দফায় কাটাছেঁড়া আর খসড়া তৈরি ছাড়া তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। দেড় দশকে এর খসড়া মন্ত্রিসভায়ও উপস্থাপন করতে পারেনি তৎকালীন সরকার। অভিযোগ রয়েছে, নোট-গাইড-কোচিং ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মহলের তদবির আর তাদের অনৈতিক সুবিধা দিতেই শিক্ষা আইন করতে তেমন কার্যকর উদ্যোগ নেননি পতিত সরকারের মন্ত্রীরা। আইন করতে বিভিন্ন সময় লোকদেখানো উদ্যোগ নিলেও তা মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপন হয়নি কখনো। শিক্ষা আইন না থাকার ফলে এ সেক্টরের বিদ্যমান বিভিন্ন অনিয়ম রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে যে দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এ আইন সহজেই করা যেত। তারা শিক্ষাকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে শিক্ষা আইন করা সম্ভব হয়নি।
তথ্যমতে নানা সমালোচনার মুখে সর্বশেষ ২০২৩ সালে এ আইন প্রণয়নে তৎপরতা শুরু করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আইনের জন্য আগের খসড়া হালনাগাদ করে নতুন খসড়া তৈরি করা হয়। এতে বলা হয়েছিল, এ আইন অনুযায়ী কোনো ধরনের নোটবই বা গাইডবই মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত করা যাবে না। এ বিধান লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ৫ লাখ টাকা অর্থদ বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নোটবই, গাইডবই কিনতে বা পাঠে বাধ্য করলে বা উৎসাহ দিলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে। এর সঙ্গে শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধান, ব্যবস্থাপনা কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। একই সঙ্গে দেশের নোট-গাইড ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে আইনের খসড়ায় বলা হয়, সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে সহায়ক বই মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত করা যাবে।
অভিযোগ রয়েছে, নোট-গাইড ব্যবসায়ীদের অনৈতিক সুবিধা দিতেই কৌশলে নোট-গাইড বৈধ করার পাঁয়তারা করেছিলেন আওয়ামী নেতৃত্বাধীন সরকারের শিক্ষামন্ত্রীরা। খসড়ায় আরও বলা হয়েছিল, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট টিউশনের মাধ্যমে পাঠদান করতে পারবেন না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে অভিভাবকদের সম্মতি সাপেক্ষে স্কুল সময়ের আগে বা পরে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করতে পারবেন। কিন্তু এ আইনের খসড়া মন্ত্রিপরিষদে উত্থাপন না হওয়ায় সব আয়োজন ভেস্তে গেছে। শিক্ষা আইনের খসড়ায় আরও বলা হয়েছিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের প্রাইভেট টিউশনের মাধ্যমে পাঠদানের উদ্দেশ্যে কোচিং সেন্টার পরিচালনা বা কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করা এ আইনে নিষিদ্ধ হবে না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলাকালে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত দিনে চালানো কোচিং সেন্টারের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা হবে। কোচিং সেন্টারে কোনো শিক্ষক তাঁর নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে পারবেন না। করলে শাস্তিযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে ভর্তির বিধান থাকায় ভর্তিচ্ছু প্রার্থীদের জন্য কোচিং সেন্টার পরিচালনা বা কোচিং সেন্টারে পাঠদান নিষিদ্ধ বা দ নীয় হবে না। সবশেষে ২০২৩ সালের অক্টোবরে দীপু মনি শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালে জানিয়েছিলেন, শিক্ষা আইন তাঁর আমলে (তিনি শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালে) আলোর মুখ দেখছে না। এরপর গত বছর আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় এলেও এ আইন করতে আর উদ্যোগী হয়নি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অতীতে যে দল ক্ষমতায় ছিল তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে শিক্ষা আইন সহজেই করা যেত। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের অঙ্গীকার থাকলে তারা শিক্ষা আইন করত। নোট-গাইড আর কোচিং ব্যবসায়ীদের কারণে এ আইন আর করা হয়নি বলে জানি। এটি খুব দুঃখজনক। তৎকালীন ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে অবৈধ নোট-গাইড আর কোচিং ব্যবসায়ীদের একটি যোগসাজশ ছিল বলে মনে হচ্ছে।’