ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম চিত্তাকর্ষক নিদর্শন বিশ্ব ঐতিহ্য (ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ) স্থাপনা বাগেরহাটের ষাটগুম্বুজ মসজিদ। নান্দনিক এই মসজিটটিতে সাত লাইনে ১১ টি করে ৭৭টি ও চার কোনায় ৪টিসহ সর্বমোট ৮১টি গম্বুজ হলেও ষাটগম্বুজ মসজিদ নামে বিশ^ব্যাপী পরিচিত। দিল্লীর সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের সেনাপতি হিসেবে (১৪৩৫ থেকে ৫৯ সালের মধ্যে) আজকের বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল বিজয় করে হাভেলি-খলিফাতাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ইসলাম প্রচারে ওই সময়ের মধ্যে বাগেরহাট শহরতলীতে নির্মাণ করে ষাটগুম্বুজ মসজিদ। ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে বাগেরহাট ষাটগুম্বুজ মসজিদসহ শহরটিকেই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়। বর্তমানে এই মসজিদের বাইরের মেঝে থেকে উপরে ও ছাদের কার্নিস থেকে নিচে লাইটিংয়ের কারণে ষাটগুম্বুজ মসজিদি কে আরো দর্শনীয় করে তুলেছে।
ঐতিহাসিক এই মসজিদটি ইটের তৈরি হলেও মধ্যে ৬০টি পাথরের পিলারের উপর ৭৭টি গম্বুজ নিয়ে দাড়িয়ে ষাটগম্বুজ মসজিদের বাইরের দিক দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৬০ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ১০৪ ফুট লম্বা। আর ভেতরে উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৪৩ ফুট ও পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৮৮ ফুট লম্বা। মসজিদের দেযায় ৮ দশমিক ৫ ফুট পুরু। মসজিদটির পূর্ব দিকের দেয়ালে রয়েছে ১১টি খিলানযুক্ত দরজা। অন্য দরজাগুলো থেকে মাঝখানের দরজাটি সবচেয বড়। আর উত্তর ও দক্ষিণ দিকের দেয়ালে দরজা আছে ৭টি করে ১৪টি। মসজিদের চারকোণে চারটি গোলাকার মিনার আছে। প্রতিটি মিনারের চূড়ায় রয়েছে একটি করে গোলাকার গম্বুজ। ছাদের কার্নিশের চেয়ে মিনারগুলোর উচ্চতা একটু বেশি। মসজিদের সামনের দিকের দুটি মিনারের একটির নাম রওশন কোঠা এবং অন্যটির নাম আন্ধার কোঠা। মিনারের ভেতরে রয়েছে প্যাঁচানো সিঁড়ি। আগে এই মিনার থেকে আজান দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। মসজিদের অভ্যন্তরে মোট ষাটটি পিলার উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ছয় সারিতে মোট ১০টি করে বিন্যস্ত। ষাটগম্বুজ মসজিদে ১১টি সারিতে মোট ৭৭টি গম্বুজ রয়েছে। আর মিনারের ওপর চারটি গম্বুজসহ মোট গম্বুজের সংখ্যা ৮১টি। মসজিদের মিহরাবের মধ্যবর্তী সারিতে সাতটি গম্বুজ ছাড়া বাকি ৭৪টি গম্বুজই অর্ধগোলাকার। মসজিদের পশ্চিম দিকের দেয়ালে মিহরাব আছে ১০টি। মাঝখানের মিহরাবটি বড় ও পোড়া মাটির কারুকার্যপূর্ণ। দক্ষিণ দিকে পাঁচটি এবং উত্তর দিকে চারটি মিহরাব রয়েছে। উত্তর পাশে মিহরাবের বদলে একটি ছোট দরজা আছে। অনেকের মতে, হযরত জাহান এটিকে মসজিদ ছাড়াও দরবার ঘর হিসেবে ব্যবহার করতেন আর এই দরজা ছিল তার প্রবেশ পথ। মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি নেই।
জনশ্রুতি রয়েছে যে, হযরত খানজাহান (রঃ) ষাটগুম্বুজ মসজিদ নির্মাণের জন্য সমুদয় পাথর সুদূর চট্টগ্রাম, মতান্তরে ভারতের উড়িষ্যার রাজমহল থেকে তার অলৌকিক ক্ষমতা বলে জলপথে পাথর ভাসিয়ে এনেছিলেন। ইমারতটির গঠন বৈচিত্রে তুঘলক স্থাপত্যের বিশেষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী দেখলে এটি যে হযরত খানজাহান (রহ:) নির্মাণ করেছিলেন সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ থাকে না। এই মসজিদটি বহু বছর ধরে ও বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল। ষাটগুম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্য (ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইডের মধ্যে একটি, এই মসজিদের কারনেই বাগেরহাট শহরটিকেই বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানের মর্যাদা দিয়েছে ইউনেস্কো। হযরত খানজাহানের অমরকৃর্তী তার সর্বোৎকৃষ্ট নির্মিত নিদর্শন বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগুম্বুজ মসজিদ দেখতে প্রতি বছর দেশী-বিদেশী লাখ লাখ পর্যটক এসে থাকেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এই মসজিদটি দেখতে দেশীয় পর্যটকদের কাছ থেকে ২০ টাকা ও বিদেশী পর্যটকদের কাছ থেকে ২০০ টাকার প্রবেশ মূল্য নিয়ে থাকে।
বিডি প্রতিদিন/এএ