এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার হলেও বেশিরভাগ যন্ত্র আমদানি নির্ভর। তবে এবার বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) সার্বিক সহায়তায় কৃষিযন্ত্র উৎপাদন ও গবেষণার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রামভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বাংলামার্ক। প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি আধুনিক কৃষিযন্ত্র আবিষ্কার করা হয়েছে। একইসাথে প্রচলিত কৃষিযন্ত্র উৎপাদন করা হচ্ছে।
কৃষি বিজ্ঞানীরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরে আধুনিক কৃষিযন্ত্র আবিষ্কার ও উৎপাদন করা গেলে কৃষিখাতে আমদানি খরচ অনেক কমে যাবে। সেই সাথে কৃষিকাজের খরচও অন্তত ৩০% কমে আসবে। বাড়বে খাদ্য উৎপাদন। তবে এক্ষেত্রে পরিবেশ প্রতিবেশের সাথে সামজ্ঞস্যপূর্ণ প্রযুক্তির উদ্ভাবনে মনোযোগ দিতে হবে। একইসাথে প্রান্তিক কৃষকরা যাতে এর সুফল ভোগ করতে পারেন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
চট্টগ্রাম শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের চন্দনাইশ উপজেলার পশ্চিম এলাহবাদে ১০ একর জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে বাংলামার্কের আধুনিক কৃষিযন্ত্র উৎপাদনের কারখানা। ‘যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান চাষাবাদের লক্ষ্যে খামার যন্ত্রপাতি গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধিকরণ (এসএফএমআরএ)’ প্রকল্পের অর্থায়নে ব্রি’র কারিগরি সহায়তায় এই কারখানায় তৈরি করা হচ্ছে নানা প্রজাতির কৃষিযন্ত্র। এরমধ্যে কিছু যন্ত্র তৈরি করা হচ্ছে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ও কাঁচামাল ব্যবহার করে। আর কিছু যন্ত্রাংশ আমদানি করে সংযুক্ত করা হচ্ছে।
শনিবার দুপুরে কারখানাটি পরিদর্শনে দেখা যায়, সেখানে ব্রি মডেলের থ্রেসার, উইডার, উইনোয়ার, চপার মেশিন, ট্রাক্টর, কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, সিডিং মেশিন, ধান শুকানোর মেশিনসহ নানা ধরণের মেশিন তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ সংযোজন ব্রির গবেষণায় আধুনিকায়ন করা গ্রেইন কালেক্টর। যা মূলত চাতালে ধান, গম, ভূট্টা সংগ্রহের কাজে ব্যবহার হবে। এর আগে এই যন্ত্রটি বিদেশ থেকে আমদানি করা হলেও এবার ব্রির গবেষণায় যন্ত্রটিকে নতুন রূপ দেয়া হয়েছে। এছাড়া হাওর অঞ্চলের কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনেরও দেশীয় রূপ দেয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, আমরা কয়েক বছর ধরে কৃষি যন্ত্রপাতি দেশীয় প্রযুক্তিতে কিভাবে উৎপাদন করা যায় সেটা নিয়ে কাজ করছি। বেশকিছু কৃষিযন্ত্র নিয়ে গবেষক দল কাজ করছেন। এই ধরণের আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদন করা গেলে কৃষকের সময় ও শ্রম বাঁচবে। একইসাথে অর্থ সাশ্রয় হবে। আমরা গবেষণা প্রকল্পে কৃষকদেরও সংযুক্ত করার চেষ্টা করছি। যাতে তাদের উপযোগী করে যন্ত্র তৈরী করা যায়।
এসএফএমআরএ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. এ কে এম সাইফ‚ল ইসলাম বলেন, কৃষিতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বিদেশ থেকে কৃষিযন্ত্র আমদানি করা। গত কয়েকবছর ধরে কৃষিযন্ত্র আমদানির পরিমাণ অনেক বেড়েছে। এতে খরচও বাড়ছে। একারণে স্থানীয় পর্যায়ে এই ধরণের উদ্যোগকে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক করতে কৃষকের হাতে অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী মূলে কৃষিযন্ত্র পৌঁছাতে হবে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
বাংলামার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিবেশি ভারত আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু আমদানি নির্ভর হওয়ায় বাংলাদেশের বেশিরভাগ কৃষক কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। আমরা আমদানিমূল্যের চেয়ে অন্তত ৩০% কম মূল্যে দেশের বাজারে কৃষিযন্ত্র সরবরাহের চেষ্টা করছি। পাশাপাশি কৃষিযন্ত্রের বাজারে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ করাই আমাদের লক্ষ্য। ব্রি আমাদের মডেল তৈরি করে দিচ্ছে। আমরা উৎপাদন ও বাজারজাত করছি।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষির সকল পর্যায়ে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে শক্তিশালী কৃষি ইকোসিস্টেম গড়ে উঠবে। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে এক জমিতে বছরে তিন থেকে চার রকমের ফসল ফলানো সম্ভব। একারণে সল্পমূল্যে কৃষকের হাতে কৃষিযন্ত্র পৌঁছাতে পারলে একদিকে কৃষক উপকৃত হবে, অন্যদিকে দেশে খাদ্য উৎপাদনে বিপ্লব সৃষ্টি হবে।
বিডি প্রতিদিন/এএ