চট্টগ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নবাব ওয়ালি বেগ খাঁ শাহী জামে মসজিদ। নগরীর চকবাজার গেলেই চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির ছয় গম্বুজ বিশিষ্ট পুরোনো দেয়ালের এই মসজিদ। ভবনটি সড়ক থেকে সাড়ে চার ফিট উপরে। দেয়ালের পুরুত্ব কমপক্ষে ৩ ফিট পর্যন্ত। দেয়ালের গায়ে এক হাত পরপর জানালার মতো খাঁচ। জমেছে শেওলা, লোহায় জং। দেখলেই যে কেউ ভাববে আধুনিক এই শহরে বুঝি বহু পুরোনো কিছুর ছোঁয়া। তবে পুরনো আকৃতি ঠিক রেখে পাশেই করা হয়েছে বহুতল ভবন। যেখানে প্রতিদিন ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকেন হাজারো মানুষ। রোজার দিনে প্রতিদিন ১ হাজার রোজার ইফতার করেন এক সাথে। দূরদূরান্ত থেকে অনেকেই এখানে ইতিকাফ করতে আসেন। এই মসজিদের প্রতি মুসল্লীদের রয়েছে আলাদা আবেগ।
জানা যায়, ১৭১৩-১৭১৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে মোঘল সম্রাটরা চট্টগ্রাম বিজয়ের নিশান হিসেবে এ অঞ্চলে কয়েকটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তারমধ্যে নবাব ওয়ালি বেগ খাঁ শাহী জামে মসজিদ অন্যতম। মোঘল ফৌজদার নবাব ওয়ালি বেগ খাঁ মোঘল সম্রাটের নির্দেশে মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে তার নামানুসারেই এটির নামকরণ করা হয়। নবাব ওয়ালি বেগ খাঁ ওই সময় মোঘল সাম্রাজ্যের চট্টগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। কেউ বলেন এই মসজিদটি সাড়ে তিনশো বছরের পুরোনো। আবার কেউ বলেন, এটি ৩১৩ বছরের পুরোনো। তবে এর প্রাচীনত্ব নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। চকবাজারের অসংখ্য বাণ্যিজ্যিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঝে ওয়ালি বেগ খাঁ শাহী জামে মসজিদ অনন্য। চকবাজার মোড়ে মসজিদের মূল ভবন ৬-৭ শতক জমির উপর বিস্তৃত হলে মসজিদের নিজস্ব ১৮ শতক জমি আছে বলে জানা গেছে।
অলি বেগ খাঁ মসজিদের ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে, অনেকেই রোজার দিনে ক্লান্ত শরীর নিয়ে মসজিদের ভেতরে বিশ্রাম করছেন। কেউ কেউ মসজিদটি ঘুরে ঘুরে দেখছেন। আর অবাক চিত্তে ভাবছেন এতো সুন্দর করে কে নির্মাণ করেছেন এই মুসলিম স্থাপনা। মসজিদের ছয় তলার উপরে ওঠতেই ধরা দিলো মসজিদের মূল আকর্ষণ হালকা কমলা রঙের বড় বড় গম্বুজ। একসময় গস্বুজগুলোতে কালো শেওলা জমে ছিল। ফলে প্রকৃত রং কি তা জানা যায়নি। কয়েক বছর আগে মসজিদ কমিটি এগুলোতে কমলা রং লাগিয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। ৬টি গম্বুজ পাশাপাশি লাগোয়া। গম্বুজগুলোর শিরোভাগে ৬টি ছোট মিনার রয়েছে। আর সামনে তিনটি বড় মিনার থাকলেও পেছনের তিনটি মিনার ভেঙে ফেলা হয়েছে।
জানা যায়, ২০১০ সালে মসজিদটি পুনরায় নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওইসময় মসজিদটি নির্মাণ করতে গিয়ে সামনের তিনটি মিনার ভেঙে ফেলেন তারা। যা নিয়ে পরিবেশ ও ইতিহাস কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রাও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। এরপর বিক্ষোভের মুখে মসজিদটির মূল অবয়ব ঠিক রেখেই শুরু হয় নির্মাণকাজ। বর্তমানে এটির সাত তলার কাজ চলমান আছে। সাত তলা ভবনটি পুরোনো মসজিদের সামনের অংশে গড়ে তোলা হয়েছে। আর ৬ গম্বুজের পুরোনো মসজিদটি আগের স্থানেই আছে। যদিও নির্মাণ কাজ করতে গিয়ে এর সৌন্দর্য নষ্ট করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ সচেতন স্থানীয়দের।
মসজিদের পেশ ইমাম মোহাম্মদ মাশহুদ বলেন, মসজিদের নির্মাণ কাজ করতে গিয়ে খুব সুন্দর পুরোনো ৩টি মিনার ভেঙে ফেলা হয়। আগেও রাস্তার কারণে মসজিদটি ছোট করে দেওয়া হয়। এটি আরও অনেক প্রশস্ত ছিল।
তিনি আরও জানান, প্রতিদিন এই মসজিদে পাঁচ ওয়াক্তে এক তলা থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত ৬-৭ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করেন। আর জুমাবারে আদায় করেন ১০ হাজার মানুষ। জুমাবারে মসজিদটিতে এতো বেশি মানুষের সমাগম ঘটে যে সড়কের আনাছে কানাছে ছড়িয়ে পড়ে।
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল